ভেজাল বালাইনাশকের অভিযোগে পুড়ল কৃষকের স্বপ্ন, নষ্ট তিন বিঘা করলাখেত
- আপডেট সময় : ০৫:২৫:৫৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ১৪ বার পড়া হয়েছে
সবুজ পাতায় ঘেরা করলাখেত। গাছে গাছে ঝুলছিল সম্ভাবনাময় ফলন। ঋণ ও ধারদেনা করে আবাদ করা সেই খেত থেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছিলেন কৃষক ইসলাম উদ্দিন। কিন্তু বালাইনাশক প্রয়োগের পর তাঁর প্রায় তিন বিঘা জমির করলাগাছ ঝলসে নষ্ট হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে দেড় লাখ টাকা বিনিয়োগ করে এখন চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার এই কৃষক। তাঁর অভিযোগ, নিম্নমানের বা ত্রুটিপূর্ণ বালাইনাশক ব্যবহারের কারণেই এ ক্ষতি হয়েছে। তবে পণ্যটির গুণগত মান কিংবা ক্ষতির প্রকৃত কারণ এখনো পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কৃষক ইসলাম উদ্দিনের বাড়ি উপজেলার মির্জাপুর তেলিপাড়া এলাকায়। তাঁর ভাষ্য, চলতি মৌসুমে প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ করে তিন বিঘা জমিতে করলার আবাদ করেন তিনি।
গত ১৮ অক্টোবর আটোয়ারী উপজেলা সদরের ফকিরগঞ্জ বাজারের বালাইনাশক ব্যবসায়ী আনিছুর রহমান লেবুর দোকান থেকে ‘পেট্রোকেম বাংলাদেশ লিমিটেড’-এর ১ হাজার মিলিলিটারের ‘এম পেড’ নামের একটি জৈব বালাইনাশক কেনেন। পরে সেটি খেতে স্প্রে করার পরদিন থেকেই গাছের ডগা শুকিয়ে যেতে শুরু করে। ধীরে ধীরে গাছ বিবর্ণ হয়ে পড়ে এবং ফল ঝরে যায়। একপর্যায়ে তাঁর পুরো করলাখেত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কৃষক ইসলাম উদ্দিন বলেন, “মাত্র দুই দফা করলা বিক্রি করতে পেরেছিলাম। এরপর ‘এম পেড’ স্প্রে করার পর থেকেই গাছের অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে। এখন গাছ মরে যাচ্ছে, ফল ঝরে পড়ছে। ধারদেনা করে চাষাবাদ করেছি। এই ক্ষতি কীভাবে পুষিয়ে নেব, তা বুঝতে পারছি না।” ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
এ ঘটনায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পাশের কৃষক ফারুক হোসেন বলেন, “ইসলাম উদ্দিনের করলাখেতের ফলন ভালো হয়েছিল। কিন্তু বালাইনাশক প্রয়োগের পর খেতের এমন অবস্থা হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত কারণ বের করা দরকার। কৃষকের ক্ষতি হলে তার প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।”
আরেক কৃষক আব্দুল কুদ্দুস অভিযোগ করেন, বিভিন্ন কোম্পানির প্রতিনিধিরা গ্রামে এসে কৃষকদের কাছে নানা ধরনের বালাইনাশক বিক্রির পরামর্শ দেন। কিন্তু কোনো পণ্য ব্যবহারে ক্ষতি হলে অনেক সময় কৃষকেরা প্রয়োজনীয় সহায়তা পান না। ইসলাম উদ্দিনের দাবি, বালাইনাশক কেনার আগে কোম্পানির প্রতিনিধিরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করলেও ক্ষতির পর থেকে তাঁদের আর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
তবে কৃষকের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বালাইনাশক বিক্রেতা আনিছুর রহমান লেবু। তিনি বলেন, “এই ওষুধ অনেক কৃষক ব্যবহার করেছেন। অন্য কারও ক্ষতির কথা শুনিনি। হয়তো স্প্রে করার নিয়মে কোনো ভুল হয়ে থাকতে পারে।”
একই কোম্পানির স্থানীয় অ্যাসিস্ট্যান্ট মার্কেটিং অফিসার সবুজ আলী বলেন, “এমনটা কেন হয়েছে, তা বুঝতে পারছি না। হয়তো তিনি ওষুধটির সঙ্গে অন্য কোনো রাসায়নিক মিশিয়ে স্প্রে করেছিলেন।” তবে বালাইনাশকটির মান, প্রয়োগপদ্ধতি এবং ক্ষতির কারণ নির্ধারণে কোনো পরীক্ষার ফল পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে, কৃষকের এমন ক্ষতির ঘটনায় কৃষি বিভাগের তদারকি ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আটোয়ারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাক আহমেদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দেড় লাখ টাকা বিনিয়োগ করে করলা চাষ করা ইসলাম উদ্দিন এখন ঋণ পরিশোধ ও সংসার চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। তাঁর দাবি, বালাইনাশকটি প্রয়োগের পরই খেতের ক্ষতি শুরু হয়েছে। তবে ক্ষতির প্রকৃত কারণ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট পণ্য ও আক্রান্ত গাছ পরীক্ষা করে দেখা জরুরি। কৃষকের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, বালাইনাশকের গুণগত মান যাচাই এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ন্যায্য প্রতিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।




















