ঢাকা ১২:৩০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo অর্থাভাবে থমকে যাওয়ার পথে শুভর পড়াশোনা, সহায়তায় এবিজি ফাউন্ডেশন Logo দেবীগঞ্জে স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তি দখলের অভিযোগ  Logo বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ জানতে বসছে আন্তর্জাতিক শিক্ষা মেলা Logo অটিজমে অবদান থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট, আন্তর্জাতিক দুই স্বীকৃতি ইয়াশা সোবহানের Logo বিশ্ববিদ্যালয় ফুটবলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সম্প্রীতির মঞ্চ এবিজি ইউনিভার্সিটি কাপ Logo এবিজি ইউনিভার্সিটি কাপ ২০২৬ শুরু, উদ্বোধনে সাবেক তারকা ক্রিকেটাররা Logo ইউরোপে পোশাকের বাজারে মন্দাভাব, উদ্বেগে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা Logo ৩০ লাখ টাকার প্রাইজমানি, আজ শুরু মাঠের লড়াই Logo বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় জাপানের সহযোগিতা আরও বিস্তারের প্রত্যাশা Logo এবিজি ইউনিভার্সিটি কাপের ক্রিকেট ও ফুটবল ম্যাচের সময়সূচি একনজরে

ইউরোপে পোশাকের বাজারে মন্দাভাব, উদ্বেগে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা

বিশেষ প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ০৬:১২:২৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

ফ্রান্সের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, ইউরোপের ক্রেতাদের পোশাক কেনায় সতর্কতা এবং পণ্যের দাম কমানোর বাড়তি চাপ—এই তিন কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ইউরোপের কোনো কোনো বাজারে রপ্তানি বাড়লেও সামগ্রিক চাহিদা ও বিক্রয়মূল্যের নিম্নমুখী প্রবণতা রপ্তানি আয় এবং কারখানার মুনাফায় চাপ তৈরি করছে। এর প্রভাব পড়ছে উৎপাদন কার্যক্রম থেকে শুরু করে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা ও বাড়তি আয়ের সুযোগেও।

গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানার সুইং অপারেটর রহিমা খাতুনের অভিজ্ঞতায় পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে। তিনি বলেন, ‘আগে রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত কাজ করে বাড়তি আয়ের সুযোগ ছিল। এখন অনেক দিন বিকেল ৫টার মধ্যেই কারখানা ছুটি হয়ে যাচ্ছে। কারখানায় এখন ওভারটাইম কম।

‘মালিকপক্ষ বলছে, ইউরোপে ক্রেতাদের অর্ডার কমে গেছে। আগে অতিরিক্ত কাজের আয় দিয়ে সংসারের খরচ চালাতে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেত। এখন বাজারসদাই ও পরিবারের অন্যান্য ব্যয় মেটানোই কঠিন হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি চাকরি হারানোর ভয়ও বাড়ছে।’

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। তবে সব দেশে একই ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি।

এই সময়ে ফ্রান্সে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ। দেশটিতে রপ্তানি আয় নেমে এসেছে ৪৪ কোটি ৯০ লাখ ডলারে। অন্যদিকে স্পেনের বাজারে রপ্তানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ। দেশটিতে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১৪ কোটি ৮৪ লাখ ডলার।

তবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যানে ইউরোপের বাজারে রপ্তানির চিত্র আরও উদ্বেগজনক। এ সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ কমে প্রায় ১ হাজার ১৯৩ কোটি ইউরোতে নেমেছে। একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি পোশাকের গড় দামও কমেছে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য কেজিপ্রতি ১৪ দশমিক ৮৭ ইউরো থেকে কমে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরো হয়েছে। অর্থাৎ পণ্য রপ্তানির পরিমাণ কমার পাশাপাশি প্রতি কেজি পোশাক বিক্রি থেকেও আগের তুলনায় কম আয় হচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশও কমেছে। আগে এই বাজারের মোট আমদানির ২১ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল বাংলাদেশের দখলে, যা কমে ১৯ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

ইউরোপে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতায় চাপ এবং খুচরা বাজারে বিক্রির অনিশ্চয়তা পোশাকের ক্রয়াদেশকে প্রভাবিত করছে। বিক্রি প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলে ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতাদের অবিক্রীত পণ্যের মজুদ বেড়ে যায়। তখন নতুন অর্ডার কমানো, পণ্য সরবরাহের সময় পিছিয়ে দেওয়া কিংবা সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কম দামে পণ্য কেনার চেষ্টা করেন তাঁরা।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পোশাক প্রস্তুতকারকদের জন্য উৎপাদন ও ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, ক্রয়াদেশ অনুযায়ী কাঁচামাল সংগ্রহ, শ্রমিক নিয়োগ এবং উৎপাদন সক্ষমতা প্রস্তুত করতে কারখানাগুলোকে আগেই অর্থ ব্যয় করতে হয়। কিন্তু উৎপাদন শুরুর পর ক্রয়াদেশ কমে গেলে কিংবা পণ্য গ্রহণের সময় পিছিয়ে গেলে সেই বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত আয় আসে না।

অন্যদিকে শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে পণ্যের বিক্রয়মূল্য কমে যাওয়ার প্রভাব আরও তীব্র হয়। এতে কারখানার মুনাফা সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার ঝুঁকিও বাড়ে।

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কিছুটা মন্থর থাকা অবস্থায় ফ্রান্সের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা নতুন উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবেলায় সদস্যদের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন বাজার সম্প্রসারণ ও পণ্যের বহুমুখীকরণে কাজ করছি, যাতে কোনো একটি বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়।’

ফ্রান্সের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা দেশটির ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন ব্যবস্থা এবং ভোক্তাদের আস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। বিক্ষোভ দীর্ঘস্থায়ী হলে দোকানপাটের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া, পণ্য সরবরাহে বিলম্ব এবং ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এর ফলে নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়া কিংবা আগের অর্ডার অনুযায়ী পণ্য সরবরাহের সময়সূচি পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিদ্যমান চাপকে শুধু ফ্রান্সের অস্থিরতার ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ইউরোপের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ভোক্তাদের ব্যয় করার সক্ষমতা, ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রির অবস্থা এবং পণ্যের মজুদও রপ্তানির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা নির্ভর করে ইউরোপের সামগ্রিক ভোগ, ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রি, মজুদ ও ক্রয়াদেশের ওপর। তাই ফ্রান্সের পরিস্থিতি একা পুরো ইউরোপীয় বাজারের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে না। তবে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে নতুন ক্রয়াদেশ ও সরবরাহের সময়সূচিতে প্রভাব পড়তে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইউরোপজুড়ে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপের কারণে পরিবারগুলো পোশাকের মতো কিছু কেনাকাটা কমিয়ে দিতে পারে। এতে খুচরা বিক্রি দুর্বল হলে ব্র্যান্ডগুলো নতুন পণ্য কেনার বিষয়ে সতর্ক হবে। একই সঙ্গে কম দামে পণ্য সংগ্রহের প্রবণতা বাড়লে বাংলাদেশের মতো সরবরাহকারী দেশগুলোকে আরও তীব্র দরকষাকষির মুখে পড়তে হতে পারে।’

পোশাকের ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি কারখানার উৎপাদন কার্যক্রমে পড়ে। উৎপাদনের চাপ কমলে শ্রমিকদের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার সুযোগও সীমিত হয়ে যায়। বিশেষ করে যেসব শ্রমিক ওভারটাইমের আয়ের ওপর নির্ভর করে সংসারের ব্যয় মেটান, তাঁদের জন্য এ পরিস্থিতি বাড়তি চাপ তৈরি করে।

দীর্ঘ সময় ধরে ক্রয়াদেশ কম থাকলে কারখানাগুলো নতুন শ্রমিক নিয়োগ সীমিত করা, কর্মঘণ্টা কমানো কিংবা উৎপাদন কার্যক্রম পুনর্বিন্যাসের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সব কারখানায় পরিস্থিতি এক রকম না হলেও ইউরোপের বাজারে চাহিদা দীর্ঘস্থায়ীভাবে দুর্বল থাকলে কর্মসংস্থান ও শ্রমিকদের আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ কারণে পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু রপ্তানির পরিমাণ বা আয় বিবেচনা করলেই হবে না। রপ্তানিমূল্য, কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা, মুনাফা এবং শ্রমিকদের কর্মঘণ্টার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে রপ্তানিকারকদের স্বল্পমেয়াদে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো, ক্রয়াদেশের পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং পণ্য সরবরাহের ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে উৎপাদন পরিকল্পনা সাজাতে হবে। একই সঙ্গে কাঁচামাল সংগ্রহ ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় নমনীয়তা বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে ক্রয়াদেশে পরিবর্তন এলেও আর্থিক ক্ষতি সীমিত রাখা যায়।

দীর্ঘমেয়াদে ইউরোপের নির্দিষ্ট কয়েকটি বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন বাজারে প্রবেশের উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে কম দামে পণ্য সরবরাহের প্রতিযোগিতার বাইরে গিয়ে তুলনামূলক বেশি মূল্য সংযোজনের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।

ফ্রান্সের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দেশটির বাজারে সাময়িক অনিশ্চয়তা কমতে পারে। তবে ইউরোপজুড়ে ক্রেতাদের ব্যয় সংকোচন, পোশাকের গড় দাম কমে যাওয়া এবং সরবরাহকারীদের ওপর মূল্যছাড়ের চাপ অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের চ্যালেঞ্জ সহজে কাটবে না।

তাই বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সামনে এখন প্রধান লক্ষ্য শুধু বিদ্যমান বাজারে রপ্তানি ধরে রাখা নয়; বরং নতুন বাজার তৈরি, পণ্যের মান ও বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা জোরদার করা। একই সঙ্গে রপ্তানি আয় ও শিল্পের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

Share this news as a Photo Card

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

25 October 2026

ইউরোপে পোশাকের বাজারে মন্দাভাব, উদ্বেগে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা

www.uttorersongbad.com

ইউরোপে পোশাকের বাজারে মন্দাভাব, উদ্বেগে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা

আপডেট সময় : ০৬:১২:২৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

ফ্রান্সের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, ইউরোপের ক্রেতাদের পোশাক কেনায় সতর্কতা এবং পণ্যের দাম কমানোর বাড়তি চাপ—এই তিন কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ইউরোপের কোনো কোনো বাজারে রপ্তানি বাড়লেও সামগ্রিক চাহিদা ও বিক্রয়মূল্যের নিম্নমুখী প্রবণতা রপ্তানি আয় এবং কারখানার মুনাফায় চাপ তৈরি করছে। এর প্রভাব পড়ছে উৎপাদন কার্যক্রম থেকে শুরু করে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা ও বাড়তি আয়ের সুযোগেও।

গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানার সুইং অপারেটর রহিমা খাতুনের অভিজ্ঞতায় পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে। তিনি বলেন, ‘আগে রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত কাজ করে বাড়তি আয়ের সুযোগ ছিল। এখন অনেক দিন বিকেল ৫টার মধ্যেই কারখানা ছুটি হয়ে যাচ্ছে। কারখানায় এখন ওভারটাইম কম।

‘মালিকপক্ষ বলছে, ইউরোপে ক্রেতাদের অর্ডার কমে গেছে। আগে অতিরিক্ত কাজের আয় দিয়ে সংসারের খরচ চালাতে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেত। এখন বাজারসদাই ও পরিবারের অন্যান্য ব্যয় মেটানোই কঠিন হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি চাকরি হারানোর ভয়ও বাড়ছে।’

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। তবে সব দেশে একই ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি।

এই সময়ে ফ্রান্সে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ। দেশটিতে রপ্তানি আয় নেমে এসেছে ৪৪ কোটি ৯০ লাখ ডলারে। অন্যদিকে স্পেনের বাজারে রপ্তানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ। দেশটিতে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১৪ কোটি ৮৪ লাখ ডলার।

তবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যানে ইউরোপের বাজারে রপ্তানির চিত্র আরও উদ্বেগজনক। এ সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ কমে প্রায় ১ হাজার ১৯৩ কোটি ইউরোতে নেমেছে। একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি পোশাকের গড় দামও কমেছে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য কেজিপ্রতি ১৪ দশমিক ৮৭ ইউরো থেকে কমে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরো হয়েছে। অর্থাৎ পণ্য রপ্তানির পরিমাণ কমার পাশাপাশি প্রতি কেজি পোশাক বিক্রি থেকেও আগের তুলনায় কম আয় হচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশও কমেছে। আগে এই বাজারের মোট আমদানির ২১ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল বাংলাদেশের দখলে, যা কমে ১৯ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

ইউরোপে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতায় চাপ এবং খুচরা বাজারে বিক্রির অনিশ্চয়তা পোশাকের ক্রয়াদেশকে প্রভাবিত করছে। বিক্রি প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলে ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতাদের অবিক্রীত পণ্যের মজুদ বেড়ে যায়। তখন নতুন অর্ডার কমানো, পণ্য সরবরাহের সময় পিছিয়ে দেওয়া কিংবা সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কম দামে পণ্য কেনার চেষ্টা করেন তাঁরা।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পোশাক প্রস্তুতকারকদের জন্য উৎপাদন ও ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, ক্রয়াদেশ অনুযায়ী কাঁচামাল সংগ্রহ, শ্রমিক নিয়োগ এবং উৎপাদন সক্ষমতা প্রস্তুত করতে কারখানাগুলোকে আগেই অর্থ ব্যয় করতে হয়। কিন্তু উৎপাদন শুরুর পর ক্রয়াদেশ কমে গেলে কিংবা পণ্য গ্রহণের সময় পিছিয়ে গেলে সেই বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত আয় আসে না।

অন্যদিকে শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে পণ্যের বিক্রয়মূল্য কমে যাওয়ার প্রভাব আরও তীব্র হয়। এতে কারখানার মুনাফা সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার ঝুঁকিও বাড়ে।

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কিছুটা মন্থর থাকা অবস্থায় ফ্রান্সের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা নতুন উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবেলায় সদস্যদের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন বাজার সম্প্রসারণ ও পণ্যের বহুমুখীকরণে কাজ করছি, যাতে কোনো একটি বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়।’

ফ্রান্সের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা দেশটির ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন ব্যবস্থা এবং ভোক্তাদের আস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। বিক্ষোভ দীর্ঘস্থায়ী হলে দোকানপাটের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া, পণ্য সরবরাহে বিলম্ব এবং ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এর ফলে নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়া কিংবা আগের অর্ডার অনুযায়ী পণ্য সরবরাহের সময়সূচি পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিদ্যমান চাপকে শুধু ফ্রান্সের অস্থিরতার ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ইউরোপের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ভোক্তাদের ব্যয় করার সক্ষমতা, ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রির অবস্থা এবং পণ্যের মজুদও রপ্তানির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা নির্ভর করে ইউরোপের সামগ্রিক ভোগ, ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রি, মজুদ ও ক্রয়াদেশের ওপর। তাই ফ্রান্সের পরিস্থিতি একা পুরো ইউরোপীয় বাজারের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে না। তবে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে নতুন ক্রয়াদেশ ও সরবরাহের সময়সূচিতে প্রভাব পড়তে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইউরোপজুড়ে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপের কারণে পরিবারগুলো পোশাকের মতো কিছু কেনাকাটা কমিয়ে দিতে পারে। এতে খুচরা বিক্রি দুর্বল হলে ব্র্যান্ডগুলো নতুন পণ্য কেনার বিষয়ে সতর্ক হবে। একই সঙ্গে কম দামে পণ্য সংগ্রহের প্রবণতা বাড়লে বাংলাদেশের মতো সরবরাহকারী দেশগুলোকে আরও তীব্র দরকষাকষির মুখে পড়তে হতে পারে।’

পোশাকের ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি কারখানার উৎপাদন কার্যক্রমে পড়ে। উৎপাদনের চাপ কমলে শ্রমিকদের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার সুযোগও সীমিত হয়ে যায়। বিশেষ করে যেসব শ্রমিক ওভারটাইমের আয়ের ওপর নির্ভর করে সংসারের ব্যয় মেটান, তাঁদের জন্য এ পরিস্থিতি বাড়তি চাপ তৈরি করে।

দীর্ঘ সময় ধরে ক্রয়াদেশ কম থাকলে কারখানাগুলো নতুন শ্রমিক নিয়োগ সীমিত করা, কর্মঘণ্টা কমানো কিংবা উৎপাদন কার্যক্রম পুনর্বিন্যাসের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সব কারখানায় পরিস্থিতি এক রকম না হলেও ইউরোপের বাজারে চাহিদা দীর্ঘস্থায়ীভাবে দুর্বল থাকলে কর্মসংস্থান ও শ্রমিকদের আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ কারণে পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু রপ্তানির পরিমাণ বা আয় বিবেচনা করলেই হবে না। রপ্তানিমূল্য, কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা, মুনাফা এবং শ্রমিকদের কর্মঘণ্টার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে রপ্তানিকারকদের স্বল্পমেয়াদে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো, ক্রয়াদেশের পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং পণ্য সরবরাহের ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে উৎপাদন পরিকল্পনা সাজাতে হবে। একই সঙ্গে কাঁচামাল সংগ্রহ ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় নমনীয়তা বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে ক্রয়াদেশে পরিবর্তন এলেও আর্থিক ক্ষতি সীমিত রাখা যায়।

দীর্ঘমেয়াদে ইউরোপের নির্দিষ্ট কয়েকটি বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন বাজারে প্রবেশের উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে কম দামে পণ্য সরবরাহের প্রতিযোগিতার বাইরে গিয়ে তুলনামূলক বেশি মূল্য সংযোজনের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।

ফ্রান্সের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দেশটির বাজারে সাময়িক অনিশ্চয়তা কমতে পারে। তবে ইউরোপজুড়ে ক্রেতাদের ব্যয় সংকোচন, পোশাকের গড় দাম কমে যাওয়া এবং সরবরাহকারীদের ওপর মূল্যছাড়ের চাপ অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের চ্যালেঞ্জ সহজে কাটবে না।

তাই বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সামনে এখন প্রধান লক্ষ্য শুধু বিদ্যমান বাজারে রপ্তানি ধরে রাখা নয়; বরং নতুন বাজার তৈরি, পণ্যের মান ও বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা জোরদার করা। একই সঙ্গে রপ্তানি আয় ও শিল্পের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

Share this news as a Photo Card