স্লোগানের আড়ালে আর্তনাদ দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়!
- আপডেট সময় : ০১:৫৩:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ৮১ বার পড়া হয়েছে
আগামী পহেলা ডিসেম্বর থেকে জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রচারাভিযানে নামবে সরকার। প্রতিপাদ্য হবে- দু’টি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন ঘরেঘরে পৌঁছে দেবেন জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী।
দু’টির বেশি সন্তান নয়, কথাটি আসলেই কি ভালো? কী বলে যৌক্তিকতা?
যৌবনে সন্তান মানুষের স্বপ্ন, দাম্পত্যের শান্তি এবং সংসার স্থায়িত্ব ও বিশ্বস্ততার সেতুবন্ধন। বার্ধক্যে সন্তান হয়ে ওঠে ভরসার প্রতিক আর মৃত্যুর পর হয় বাবা-মার অস্তিত্বের স্বাক্ষী, টিকিয়ে রাখে বংশপরম্পরার ধারা।
ধরুন কেউ দু’টি সন্তান নিল। এক ছেলে, এক মেয়ে। জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ করে চলে গেলো বার্ধক্যে। স্ত্রী হয়ে গেলো বন্ধ্যা বুড়ি আর স্বামী হয়ে পড়লো বয়সের ভাড়ে ন্যূয়ে পড়া কুঁজো বুড়ো। মেয়েকে পাঠিয়ে দিলো শ্বশুর বাড়ি। বুড়োবুড়ির জন্য বাড়ীতে রয়ে গেলো একটাই সন্তান, পুত্র।
কোনও কারণে যদি বাবা-মার বার্ধক্যে একমাত্র পুত্র সন্তান মৃত্যু বরণ করে, কী উপায় হবে দু’টি সন্তান নিয়ে বুড়ো হওয়া এই বৃদ্ধ দম্পতির! না পারবে বুড়ো বয়সে সন্তান নিতে, না থাকবে বার্ধক্যে দেখভালের কেউ আর না থাকলে বংশের পরবর্তী প্রজন্ম! একেবারে না নির্বংশ হয়ে যাবে?
আমার এক মুসল্লি ভাই প্রায়ই আসেন। চুপচাপ বসে থাকেন। বিষণ্ণ মুখ। কথা বলতে গিয়ে চোখ ভিজে যায়। শোনান ফেলে আসা যৌবনের গল্প।
যৌবনে ছিলেন শক্তি ও সামর্থ্যবান। শরীরে শক্তি, মনে উন্মাদনা। রোগ-বালাই নেই, অভাব নেই। যেভাবে মন চায় সেভাবেই চলতেন। আয় করতেন, সম্পদ বাড়ানোর নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতেন। বার্ধক্যের কথা কখনো মনেও আসতো না। মনে হতো, যৌবন ফুরাবার নয়। প্রয়োজন শুধু টাকার।
তখন রাষ্ট্রীয় স্লোগান ছিল— “দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়।” এই চটকদার কথাটিকেই তিনি সত্য মনে করেছিলেন। ভেবেছিলেন, সন্তান বেশি হলে খাবে কী, পরবে কী? সন্তান বেশি হলে সম্পদ ভাগ হবে, রিজিক কমবে। জনসংখ্যাকে মনে হতো বোঝা। একবারও মনে হয়নি, জনসংখ্যাই জনসম্পদ। সন্তানই বার্ধক্যের লাঠি, একাকীত্বের সঙ্গী।
প্রথমে একটি সন্তানই নিয়েছিলেন। মেয়ে হওয়ায় আবার নিলেন সন্তান। দ্বিতীয়টি ছেলে হলো। এরপরই তিনি সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করলেন আর সন্তান নয়। স্ত্রীকে অপারেশন করিয়ে বন্ধ্যা করে দিলেন। যুক্তি ছিল — দুটি সন্তানের বেশি নয়।
এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে সুখেই কাটছিল দিন। যৌবনের স্বচ্ছলতা পেরিয়ে জীবন এসে দাঁড়ালো বার্ধক্যের দরজায়। ওপেন হার্ট সার্জারি হয়েছে, কর্মব্যস্ততা কমে গেছে।
মেয়ে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে শ্বশুরবাড়ি চলে গেছে। মুহূর্তেই ঘরটা খালি হয়ে গেছে। বাইরে থেকে ঘরে ফিরলে বুকের ভেতর হাহাকার করে ওঠে। তখন মনে হয়, দুটি সন্তান নিয়ে ভুল হয়েছে। আরো দু-চারটি সন্তান থাকলে ঘরটা এত খালি লাগতো না।
ছেলে লেখাপড়া শেষ করে চাকরি করছে। বিয়ের প্রস্তুতি চলছিল। ঠিক তখনই ঘটলো এক অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা। অফিস থেকে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় পড়লো একমাত্র ছেলে। ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার পথেই মারা গেল।
একজন গেল শ্বশুরবাড়ি, আরেকজন গেল কবরদেশে।
এখন তিনি একা। চাইলেও আর সন্তান নিতে পারবেন না। নিজে বৃদ্ধ, স্ত্রীকে আগেই বানিয়েছেন বন্ধ্যা। যৌবনের সব শ্রম ব্যয় করেছেন সম্পদের পাহাড় গড়তে কিন্তু আজ এই সন্তানহীন বিরান বাড়িতে সেই সম্পদ কে ভোগ করবে?
দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয় — স্লোগানটি ভালো ছিল, কিন্তু শেষটা ভালো হলো না। বার্ধক্যে নেমে এলো একাকীত্ব, বাড়ি হলো ভূতুড়ে, ঘর হলো শূন্য আর বুড়ো-বুড়ি হয়ে গেলেন নির্বংশ।
এটাই হলো একটি ভুল স্লোগানের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক জীবনের ট্র্যাজেডি। তাই দু’টি সন্তানের বেশি নয় একটি হলে ভালো হয় এটা একটা অযৌক্তিক স্লোগান। অন্তত তিন কিংবা চারটি সন্তান হলেই কেবল বার্ধক্য হতে প্রশান্ত এবং নিশ্চিন্ত!























