নজরে একজন, প্রশ্ন সবার?
- আপডেট সময় : ১২:২২:৩১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ৯৩ বার পড়া হয়েছে
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে নিজ কক্ষে ধূমপান করায় এক চিকিৎসককে বরখাস্তের নির্দেশ দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। ঘটনাটি কর্মক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ও পেশাগত দায়িত্ববোধের প্রশ্নে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে- প্রধানমন্ত্রীর নজরে পড়া একজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে, একই আচরণে অভ্যস্ত অন্যদের ক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে?

মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা, চিকিৎসক ও শিক্ষকদের কেউ কেউ নিজ নিজ কক্ষে ধূমপান করেন, এমন অভিযোগ ও অভিজ্ঞতা জনমনে প্রশ্ন তৈরি করে। তাঁদের ক্ষেত্রেও কি একই নিয়ম কার্যকর হবে, নাকি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কেবল কারও আচরণ কর্তৃপক্ষের নজরে এলে?
প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসা একটি ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি, বিধিনিষেধের ধারাবাহিক প্রয়োগ এবং সবার জন্য সমান জবাবদিহি।
পদমর্যাদা নয়, নিয়মের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নিতে হবে। একজন চিকিৎসক, শিক্ষক কিংবা সরকারি কর্মকর্তা, কেউই প্রতিষ্ঠানের নিয়মের ঊর্ধ্বে নন। কর্মক্ষেত্রে ধূমপানসংক্রান্ত বিধিনিষেধ লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে তা যাচাই করে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থাও বাড়বে।
ধূমপান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি মাদকবিরোধী কার্যক্রমের সঙ্গেও জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ। ধূমপান ও অন্যান্য মাদকদ্রব্যের আইনি শ্রেণি এক নয়, তবে তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব সুপ্রতিষ্ঠিত। তাই মাদক নির্মূলের পাশাপাশি তামাকের ক্ষতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ধূমপান নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। নেতা, শিক্ষক, চিকিৎসক ও সরকারি কর্মকর্তারা শুধু বক্তব্যের মাধ্যমে নয়, নিজেদের আচরণের মাধ্যমেও অন্যদের প্রভাবিত করেন। বিশেষ করে তরুণেরা বড়দের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখে। ফলে তাঁদের আচরণে দায়িত্বশীলতার প্রতিফলন ঘটলে তরুণদের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা গড়ে তোলা সহজ হয়।
তরুণ প্রজন্মকে ধূমপানের ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রয়োজন সচেতনতামূলক কর্মসূচি, নিয়মিত নজরদারি এবং বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত ব্যবস্থা। শুধু অভিযান বা শাস্তি নয়, ব্যক্তিগত উদাহরণও সমাজ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নজরে পড়েছে বলেই যদি ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে নজরের বাইরে থাকা অনিয়মগুলোর দায় কে নেবে? এ প্রশ্নের উত্তর ব্যক্তিনির্ভর পদক্ষেপে নয়, বরং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় নিহিত।
আমরা এমন একটি ব্যবস্থা চাই, যেখানে নিয়ম সবার জন্য সমান, জবাবদিহি নিশ্চিত এবং দায়িত্বশীল আচরণই হবে নেতৃত্বের পরিচয়। নেতৃত্ব যদি নিজেরাই নিয়ম ভাঙে, তবে তরুণদের নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়ার অধিকারও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। মনে রাখতে হবে, আজ বড়দের অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে, আগামীকাল সেই অনিয়মই সমাজের নিয়মে পরিণত হবে, আর তার ভয়াবহ মূল্য দিতে হবে পুরো জাতিকে।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা, লাল সবুজ উন্নয়ন সংঘ






















