আত্মগোপন এবং আতঙ্ক, কেমন কাটছে আওয়ামী লীগ নেতাদের সময়?
- আপডেট সময় : ১২:৫৩:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩১ বার পড়া হয়েছে
ছবি সংগৃহীত
রাজনীতির পালাবদলের পর অনেকের জীবনেই নেমে আসে অনিশ্চয়তা। পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে আত্মগোপনে থাকা, স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া কিংবা প্রতিটি মুহূর্তে অজানা আশঙ্কায় দিন কাটানো—এসব অভিজ্ঞতা বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে হয়তো তার চেয়েও কঠিন।
ধর্মীয় সূত্রে আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তিনি শেখ পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। শেখ পরিবারের কাছ থেকে তিনি বিভিন্ন সময়ে উপহার-উপঢৌকনও পেয়েছেন বলে আমি জানি। পারিবারিক নানা ধর্মীয় বিষয়ে তিনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন এবং কখনো কখনো আমাকে তাঁর বাসায়ও নিয়ে যেতেন।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। দীর্ঘ সময় দেশেই অবস্থান করলেও পরবর্তীতে তিনি দেশের বাইরে চলে গেছেন।
কিছুদিন আগে হোয়াটসঅ্যাপে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। আলাপের একপর্যায়ে আত্মগোপনে থাকার অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “আত্মগোপনে থাকার চেয়ে ভয়ানক কিছু আর নেই।”
তাঁর কথায়, সারাক্ষণ এক ধরনের অজানা আতঙ্ক কাজ করে। দূর থেকে কোনো অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ শুনলেও মনে হয়, পুলিশ বুঝি এসেছে। স্বাভাবিকভাবে ঘুমানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। ঘুমের মধ্যেও সামান্য শব্দে চমকে উঠতে হয়—আবার কেউ এসেছে কি না, সেই আশঙ্কায়।
কথাগুলো বলতে বলতে তাঁর কণ্ঠে যে ভয় ও অনিশ্চয়তার ছাপ অনুভব করেছি, তা সহজে ভুলে যাওয়ার নয়।
আমাদের আত্মীয়দের মধ্যেও একজন জ্যেষ্ঠ ব্যক্তি রয়েছেন, যিনি পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিটের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা ছিলেন। ৫ আগস্টের পর তিনিও অনেকটা নিভৃতে জীবনযাপন করছেন।
একদিন তাঁর সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা হয়। নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “সময়টা এত কঠিন যাচ্ছে যে, গাছের শুকনো পাতা মাটিতে পড়ার শব্দও কখনো কখনো মনে হয়—কেউ বুঝি অনুসরণ করছে।”
তাঁর ভাষায়, চারপাশের সামান্য শব্দও তখন সন্দেহ তৈরি করে। কখনো মনে হয় কেউ পিছু নিয়েছে, কখনো মনে হয় দরজার বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। ফলে স্বাভাবিক জীবনযাপনেও এক ধরনের অস্বস্তি ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।
আত্মগোপনে থাকা মানুষের জীবন হয়তো এমনই—দিন যায়, রাত আসে; কিন্তু স্বাভাবিকতার সেই অনুভূতি আর ফিরে আসে না। পরিচিত শহর, পরিচিত মানুষ কিংবা নিজের ঘর থেকেও দূরে থাকতে হয়। ফোনে কথা বলার সময়ও চারপাশ দেখে নিতে হয়, কোথায় আছেন তা জানানোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হয়।
রাজনীতির মাঠে যারা একসময় প্রকাশ্যে ছিলেন, মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতেন, সভা-সমাবেশে বক্তব্য রাখতেন, তাদের কারও কারও জীবনে এখন এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা। কেউ দেশে থেকেও আত্মগোপনে, কেউ আবার দেশ ছেড়ে বিদেশে অবস্থান করছেন।
তবে এই অভিজ্ঞতাগুলো মূলত ব্যক্তিগত বক্তব্য ও অভিজ্ঞতার বর্ণনা। প্রত্যেক আত্মগোপনে থাকা ব্যক্তি একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন—এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারও বিরুদ্ধে মামলা বা আইনি অভিযোগ থাকলে তার বিচারিক প্রক্রিয়াও আলাদা বিষয়।
তবু ব্যক্তিগত এই কথোপকথনগুলো একটি মানবিক প্রশ্ন সামনে আনে—রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতা কিংবা প্রভাবের বাইরে একজন মানুষ যখন দিনের পর দিন অজানা আশঙ্কা নিয়ে বেঁচে থাকেন, তখন তাঁর মানসিক জগতটা কেমন থাকে?
ক্ষমতার আলো থেকে আড়ালে চলে যাওয়া মানুষগুলোর গল্প তাই শুধু রাজনীতির গল্প নয়; এটি ভয়, অনিশ্চয়তা, অপেক্ষা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষারও গল্প।
লেখক
কবি, কথাসাহিত্যিক, গবেষক ও উপস্থাপক
ইমাম ও খতীব, বিরুলিয়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ ঢাকা
সাহিত্য সম্পাদক, জাতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র
























