স্মার্টফোনের যুগে শৈশব কতটা নিরাপদ?
- আপডেট সময় : ১০:৩৬:৩৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ১২৩ বার পড়া হয়েছে
কুমিল্লায় এক মাসের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া দুটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে।
কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতীম হত্যাকাণ্ডের শোক কাটতে না কাটতেই সামনে এলো ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের নির্মম হত্যাকাণ্ড। কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলার মধ্যেই আরেক কিশোরীর এমন করুণ পরিণতি আমাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ কুমিল্লায় এ ধরনের ঘটনা নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক।
কিন্তু শুধু শোক প্রকাশ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ কিংবা অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করলেই কি আমাদের দায়িত্ব শেষ? প্রতিটি ঘটনার পর কয়েক দিন আলোচনা হয়, সচেতনতার কথা বলা হয়। তারপর সবকিছু আবার আগের মতো চলতে থাকে। অথচ শিশু-কিশোরদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র হিসেবে আমরা কতটা দায়িত্ব পালন করছি, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
জান্নাতুল তাজমিন কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। ফেসবুকের মাধ্যমে কক্সবাজারের একটি হোটেলে কর্মরত রাজু চৌধুরী নামে এক তরুণের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। মাত্র ১৭ দিনের পরিচয়ের সূত্র ধরে তাজমিন পরিবারের অজান্তে রাজুর আমন্ত্রণে কক্সবাজারে যায়। সেখানে একটি হোটেলে তারা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে রাতযাপন করে। পরে রাজু তাজমিনের কুমিল্লায় ফেরার জন্য গাড়ির টিকিট কেটে তাকে একটি কুমিল্লাগামী গাড়িতে তুলে দেন। গত ৭ অক্টোবর রাতে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় ফেরার পথে পদুয়ার বাজার এলাকায় বাস থেকে নেমে বাড়ি যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠে তাজমিন। পুলিশের তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়া তাকে ধর্ষণ ও হত্যা করেন। পরে লালমাই উপজেলার একটি ধানখেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ঘটনায় সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
একটি শিশুর জীবন এভাবে শেষ হয়ে যাওয়া আমাদের ব্যথিত করে। এই হত্যাকাণ্ডের দায় অপরাধীর। কোনো শিশুর অপরিণত বয়স, ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব তার ওপর সংঘটিত অপরাধকে কোনোভাবেই ন্যায্যতা দিতে পারে না। তবে এ ঘটনা শিশুদের নিরাপত্তা, অভিভাবকদের ভূমিকা এবং অনলাইন জগতের ঝুঁকি নিয়ে জরুরি প্রশ্নও সামনে এনেছে।
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীর হাতে আইফোন কেন? এখানেই আমার প্রশ্ন- একজন সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীর হাতে দামি আইফোন কীভাবে এলো? কে তাকে ফোনটি দিয়েছিল? সে কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করত? অনলাইনে কার সঙ্গে যোগাযোগ করত, এসব বিষয়ে তার অভিভাবকেরা কতটা জানতেন?
আমি স্মার্টফোন ব্যবহারের সম্পূর্ণ বিরোধী নই। প্রযুক্তি শিক্ষা ও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু একটি শিশু কোন বয়সে, কী উদ্দেশ্যে এবং কতটা স্বাধীনভাবে স্মার্টফোন ব্যবহার করবে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
শিশু খাবার খেতে না চাইলে, কান্না থামাতে কিংবা তাকে ব্যস্ত রাখতে আমরা প্রায়ই হাতে মোবাইল তুলে দিই। এভাবেই অনেক শিশু ছোটবেলা থেকে মোবাইলের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু আমরা কি খোঁজ রাখি, সে ফোনে কী দেখছে, কার সঙ্গে কথা বলছে কিংবা কোন বিষয়গুলো তার চিন্তা ও আচরণকে প্রভাবিত করছে?
শুধু দামি ফোন কিনে দেওয়া কিংবা সন্তানের সব আবদার পূরণ করাই দায়িত্বশীল অভিভাবকত্ব নয়। প্রযুক্তির সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি এর নিরাপদ ব্যবহার শেখানোও জরুরি।
অনেক বাবা জীবিকার প্রয়োজনে প্রবাসে কিংবা দেশের অন্য কোথাও থাকেন। পরিবারের জন্য অর্থ পাঠান, সন্তানের প্রয়োজন মেটান। কিন্তু সন্তানের পড়াশোনা, বন্ধুবান্ধব ও মানসিক অবস্থার খোঁজ নেওয়ার সময় কতটা থাকে।
মা-বাবা নিজেরাই যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেসবুক, টিকটক কিংবা বিভিন্ন ভিডিওতে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে সন্তানকে শুধু পড়াশোনার উপদেশ দিয়ে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব? শিশুরা শুধু উপদেশ শুনে বড় হয় না, তারা বড়দের আচরণ দেখেও শেখে। সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলতে হবে, তার সমস্যাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। পরিবারে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে সন্তান ভয় না পেয়ে নিজের কথা বলতে পারে এবং বিপদে পড়লে সবার আগে মা-বাবার সাহায্য চাইতে পারে। শাসন নয়, বিশ্বাস ও আন্তরিকতাই হোক পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তি।
প্রমথ চৌধুরীর ‘বই পড়া’ প্রবন্ধে শিক্ষা ও বই পড়ার অভ্যাস নিয়ে যে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা উঠে এসেছে, তা আজও প্রাসঙ্গিক। প্রকৃত শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিশুদের নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং সঠিক-ভুলের পার্থক্য বোঝাতে হবে।
তাদের শেখাতে হবে, অনলাইনে পরিচিত প্রত্যেক মানুষ বিশ্বাসযোগ্য নয়। অল্প দিনের পরিচয়ে কাউকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা, ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করা কিংবা পরিবারের কাউকে না জানিয়ে দূরে কোথাও চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে সচেতন করতে গিয়ে সন্তানকে ভয় দেখানো বা দোষারোপ করা যাবে না। বরং এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে সে বিপদে পড়লে নির্দ্বিধায় সাহায্য চাইতে পারে।
শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ, রাষ্ট্র ও প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাতে হবে। কোনো শিশু নিখোঁজ হলে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া এবং সময়মতো সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও কার্যকর করতে হবে।
লাল সবুজ উন্নয়ন সংঘের হয়ে গত সাড়ে ১৫ বছর ধরে দেশের মানুষের জন্য কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, সচেতনতা একটি বড় শক্তি। সঠিক সময়ে সঠিক শিক্ষা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক উদ্যোগ অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে।
তাজমিন আর কখনো বাড়ি ফিরবে না। তার পরিবারের শোক কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। হোটেল কর্মী রাজু তাকে কক্সবজার যেতে বলেছে, স্বামী সেজে তাজমিনের সাথে রাত কাটিয়েছে তার বিরুদ্ধেও তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
স্মার্টফোন কেড়ে নেওয়াই সব সমস্যার সমাধান নয়। প্রয়োজন বয়সোপযোগী ব্যবহার, দায়িত্বশীল তদারকি, পারিবারিক বন্ধন এবং নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ। আজ প্রশ্ন শুধু সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীর হাতে আইফোন কেন, তা নয়; প্রশ্ন হলো- আমরা কি আমাদের সন্তানদের যথেষ্ট সময়, সঠিক শিক্ষা ও নিরাপদ পরিবেশ দিতে পারছি? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করাই হোক তাজমিনের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার।
লেখক: সংগঠক ও কলামিস্ট



















